image
Image

Share Article:

Productive Life

কর্মক্ষেত্রে মানষিক স্বাস্থ্যের অগ্রাধিকার এখন সময়ের দাবি

প্রাত্যহিক জীবনে আমরা প্রত্যেকেই ছুটে চলেছি জীবন ও জীবিকার পেছনে। আর আমাদের জীবিকা টা আসে আমাদের কর্মক্ষেত্র দিয়েই। কিন্তু আমাদের কর্মক্ষেত্রে যদি মানসিক স্বাস্থ্য সুনিশ্চিত না থাকে তাহলে ব্যক্তি জীবনেও তার প্রভাব পড়ে। কর্মক্ষেত্রে একজন কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা গেলে তা অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি লাভজনক হয়ে থাকে। যখন একজন কর্মী মানসিক সুস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে তুলনামূলকভাবে যার মানসিক সুস্বাস্থ্যের ঘাটতি আছে তার থেকে অনেক বেশি কাজে মনোযোগী থাকে এবং দক্ষতার সাথে কাজ করে যা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির ওপর বড় একটা প্রভাব ফেলে। কাজের পরিবেশ কিংবা কর্মীদের মধ্যে মানসিক সুস্বাস্থ্যের ঘাটতি থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানে নানারকম জটিলতা দেখা দেয় যেমন কাজে আগ্রহ না পাওয়া, কাজের চাপ বোঝা মনে করা, সহকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে না পারা, বসের সাথে সম্পর্কের উন্নতি করতে না পারা, কর্মক্ষেত্রে এ সব কিছুই একটা বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যা ব্যক্তি জীবনে এবং অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। 


সারা বিশ্বে ৬০ শতাংশ মানুষ কোন না কোন চাকরিতে কর্মরত আছেন যাদের মধ্যে প্রায় ১৬ শতাংশ মানুষেরই মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রয়োজন আছে। এর মাঝে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাটা দেখা যায় তা হল অতিরিক্ত কাজের চাপ যা একজন কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয় ফলে তা অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শুধুমাত্র হতাশা এবং উদ্বেগের কারণে প্রতিবছর  প্রায় ১২০০ কোটি  কর্ম দিবস নষ্ট হয় । এক হিসাবে দেখা গেছে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে প্রতিবছর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, কর্মক্ষেত্রের বাইরে এই ক্ষতির পরিমাণ ৩ ট্রিলিয়ন ডলার।


সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রয়োজন আছে এমন মানুষদের মধ্যে মাত্র ৮ ভাগ মানুষ সেবা নিতে পারছেন, ৯২ শতাংশই মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বাইরে রয়ে যান। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন করতে হলে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার ওপর গুরুত্ব জোরালো করা এখন সময়ের দাবি।


কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে আমরা বেশ কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি যেমন :


১. কাজের চাপের পরিমিত মাত্রা: কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির জন্য সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি পরিলক্ষিত হয় তা হল অতিরিক্ত কাজের চাপ। একজন কর্মী যখন অতিরিক্ত কাজের চাপে পড়ে যান তখন তিনি কিছুটা বেসামাল হয়ে পড়েন ফলে তার কর্মদক্ষতা হারায়। অনেক সময় দেখা যায় বসের সাথে সুসম্পর্ক না থাকলে ইচ্ছেপূরক কোন কর্মীর ওপরে অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেয়া হয় যা সেই কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। সেক্ষেত্রে পরিমিত মাত্রায় কাজ প্রদান করলে কাজের দক্ষতা এবং মান অক্ষুন্ন থাকে,পাশাপাশি কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে। 


২. ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনের সমন্বয়: জীবনের মূল দুটি অংশ হচ্ছে ব্যক্তিগত জীবন এবং পেশাগত জীবন। প্রতিটা মানুষের জীবনেই নানা রকম সমস্যা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কেউ যদি এই দুটির সমন্বয় করতে না পারে তবে তার প্রভাব উভয় ক্ষেত্রেই সমানভাবে বিরাজ করে। কর্মক্ষেত্রের কোন নেতিবাচক প্রভাব যেন ব্যক্তিগত জীবনে না আসে আবার ব্যক্তিগত কোন সমস্যা যেন কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার কোনো কারণ না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে এ দুটির মাঝে সমন্বয় করতে পারলে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার সম্ভব। 


৩. কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ: কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ একজন কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ যদি মানসিক প্রশান্তির জায়গা না হয় তাহলে সেখানে কাজের প্রতি বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হয় যা কেবল মানসিক স্বাস্থ্যের উপরেই না বরং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরেও প্রভাব ফেলে। কর্মপরিবেশ যদি কর্মীর অনুকূলে থাকে তবে কর্মী সেখানে কাজ করে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে ফলে তার কাজের স্পৃহা এবং কর্মদক্ষতা বহুগুণ বেড়ে যায়।


৪. সহকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক: একটি পরিবারের পাঁচজন সদস্য যেমন এক রকম হয় না ঠিক তেমনি কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম মানুষ বিভিন্ন রকম মানসিকতার হবে এটাই স্বাভাবিক। অনেক সময় সহকর্মীদের সাথে মতের মিল নাও হতে পারে কিন্তু মতের মিল না হলেই তার সাথে বিবাদে লিপ্ত না হয়ে বরং সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখায় মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক। কারণ একটি কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ কখনোই মানসিক প্রশান্তির জায়গা হতে পারে না। সহকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক কর্মক্ষেত্রের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি করে। 


৫. পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় রাখা: কর্মক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় একে অন্যকে নিচু করে দেখানোর প্রবণতা থাকে অনেকের মাঝে। আবার অনেক সময় সিনিয়রদের দ্বারা জুনিয়ররা বুলিং এর শিকার হয়ে থাকে অথবা বডি শেমিং করা হয় যা সেই কর্মীর ওপরে ভয়াবহভাবে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলতে পারে। প্রত্যেকের উচিত সহকর্মীর প্রতি সম্মান বজায় রাখা এবং কারো প্রতি যেন অসম্মান না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা। যে ব্যক্তিটি অন্যকে অসম্মান করে সে যদি নিজেকে তার জায়গায় বসিয়ে চিন্তা করে তাহলে নিজে যেই সম্মানটা আশা করে ঠিক সেই সম্মানটাই অন্যকে দিতে পারলে তবেই নিজের এবং অন্যের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে। 


৬. এমপ্যাথেটিক হওয়া: কর্মক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি এমপ্যাথি থাকা খুবই জরুরী। বিশেষ করে নারী কর্মীদের ঘরে বাইরে নানান রকম প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করতে হয়। সেক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে যদি সহকর্মীদের সহমর্মিতা না থাকে তাহলে একজন নারীর জন্য কাজ করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে ফলে তার মাঝে হতাশা এবং উদ্বেগ বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে তার প্রতিটা কাজে এমনকি পরিবারে। এছাড়াও কর্মক্ষেত্রে নবীন কিংবা প্রবীণদের অনেক সময় কাজে অনেক ভুল হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে তাদেরকে সমালোচনা না করে বরং তাদের ভুল শুধরে দিতে সাহায্য করা উচিত যাতে সে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে।


৭. কাজের স্বীকৃতি প্রদান: বহু গবেষণায় দেখা গেছে একদলকে কাজের পর তাদের কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ পুরস্কৃত করা হয়েছে এবং অন্য দলকে কোন পুরস্কার দেওয়া হয়নি, ফলাফলে দেখা গেছে,যে দলকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল পরবর্তীতে তাদের কাজের আগ্রহ এবং কর্মদক্ষতা বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ছোট ছোট সাফল্যের পর সেটা উদযাপন করা এবং কাজের প্রশংসা করলে কর্মীর কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ে ও সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে অনুপ্রাণিত হয় এবং কর্মক্ষেত্রের প্রতি অন্যরকম ভালোবাসা জন্মায়। এতে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে। 

Farzana Yeasmin

Wed, 08 Jan 2025
More Blogs
Our Books
Upcomig Mind Trainings